Breaking News

রিকশা চালিয়ে দিলেন বিসিএস, চাকরি পেয়ে মাকে চড়ালেন স্বপ্নের বিমানে

বিমানের আওয়াজ কানে বাজলেই আকাশের দিকে যেকোনো কেউ একবার হলেও তাকান। গ্রাম হলে তো কথাই নেই; বিমান দেখতে ঘর থেকে দৌড়ে উঠোনে চলে আসেন বাচ্চাদের সঙ্গে বৃদ্ধরাও। গীরু বালা রায় তেমনই একজন।

আকাশে ওড়া বিমান দেখতে দেখতে প্রায়ই আফসোস করতেন আর বলতেন, ‘ যদি একদিন চড়তে পারতাম….’ এ বলে দীর্ঘ নিশ্বাস নিতেন। কারণ গীরু বালা রায়ের সংসারে অনটন। নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা। আর এভারেস্টের চূড়ায় উঠার মতোই দুঃস্বপ্ন বিমানে চড়া। তবু ছোট ছেলে শিপন রায় মাকে কথা দিয়েছিলেন । বলেছিলেন চাকরি হলেই পূরণ করবেন মায়ের স্বপ্ন। অবশেষে মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।

গত বুধবার বিকেলে আদরের ছোট ছেলে শিপন রায় ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে চড়িয়ে মাকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আনেন । এর আগের দিন মঙ্গলবারেই শিপন রায় ৩৮তম বিসিএসের নন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন ।

শিপন রায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এমএ প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় হন। এমফিল করারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর মধ্যেই এলো মায়ের স্বপ্ন পূরণ করা ছেলেটির চাকরির সুখবর।

যদিও শিপনের উঠে আসার গল্পটা অনেক সংগ্রামের। কী করেননি এ জীবনে। তার লড়াই শুরু হয়১০ বছর বয়স। রিকশা চালিয়ে প্রথম রোজগার। নরসুন্দরের কাজ, ধান রোপণ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাঁকড়া, তেল, সবজি, মাছ-শুঁটকি বিক্রি সব পেশাতেই শিপনের হাত বসাতে হয়েছে । শুধু তাই নয়; গরুর গোবর দিয়ে লাকড়ি বানিয়েও জীবনের তাগিদে বিক্রি করেছেন। করোনায় গ্রামে গিয়ে ৭০ শতক জমিতে নিজেই আমনের বর্গাচাষ করছেন। এবার পূরণ করলেন মায়ের স্বপ্ন।

শিপন রায় বলেন, নন ক্যাডারে সরকারি মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক (বাংলা) হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হতেই মায়ের স্বপ্নপূরণে তড়িঘড়ি করে নেমে পড়ি। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে প্রায় মধ্যরাতে বিমানের টিকিট জোগাড় করি। বুধবার ভোরে ফেনীর সোনাগাজীর চরচান্দিয়ার বাড়ি থেকে রওনা হই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে। বিকেল তিনটার ফ্লাইটে চড়ে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে নামি। সেখান থেকে পুনরায় ঘরে ফেরা।

মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে শিপন রায়ের মুখেও হাসি ফুটেছে। শিপন বলেন, ‘মায়ের বয়স বাড়ছিল। এখন ৬২ বছর। জীর্ণশীর্ণ শরীরে নানা ধরনের রোগও বাসা বেঁধেছে। তাই ক্রমাগত মনের ভেতর ঘুরফাঁক খেত একটা প্রশ্ন, মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো তো? সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, চাকরিটা দ্রুতই হলো।’

বিমানবন্দর আর বিমানের ভেতরে স্মারক হিসেবে মায়ের সঙ্গে নানা ছবি তুলে রেখেছেন শিপন রায়। তার একটি ছবিতে দেখা যায়, ধপধপে সাদা শার্ট পরা ছেলের পাশে বসে আছেন মা গীরু বালা রায়। হাসির ঢেউ মুখজুড়ে উপচে পড়ছে । হাত উঁচিয়ে ছেলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেখাচ্ছেন ভি চিহ্ন।

চট্টগ্রামে নামার পর প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন গীরু বালা রায়। তিনি বলেন, আমার দুটি স্বপ্ন ছিল এ জীবনে। ছেলের চাকরির খবর শোনা আর বিমানে চড়া। দুদিনে দুটোই পূরণ হয়ে গেছে। আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই।

২০০৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শিপন। তখনই বাবা স্বপ্ন রায়কে হারান তিনি। অভাবের সংসারে দুঃখ-কষ্ট লেগে ছিল সারা বছরই। শিপনের মা গীরু বালা রায়ের সারাজীবনই কেটেছে এ ঘরে ও ঘরে কাজ করে। এখন ৬২ বছর বয়স বলে সেটিও আর পারেন না।

নরসুন্দরের কাজ করেন শিপনের এক ভাই। আরেক ভাই চালান রিকশা। বিয়ে করে তারা দুজনই আলাদা সংসারে উঠেছেন। মায়ের খরচ জোগান তিন ভাই মিলে। বলতে গেলে মাথা গোঁজার জন্য বসতভিটা তোলার এক টুকরো জায়গাও তাদের নেই।

সেজন্য পড়ালেখা চালিয়ে নিতে শিপনকে প্রায় সব কাজেই হাত দিতে হয়েছে । শিপন হাসতে হাসতে বলেন, ২৬ ধরনের কাজ করেছি ২৮ বছরের জীবনে। প্রায় ১০ বছর নাপিতের কাজ করেছি। মানুষের ঘরের টয়লেটও পরিষ্কার করেছি। কদিন আগেও জমিতে কাজ করলাম।

অবশ্য এ দীর্ঘ সংগ্রাম জীবনে মানুষের নানা সহযোগিতাও পেয়েছেন শিপন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের শুরু থেকেই পাচ্ছেন ফেসবুকভিত্তিক সংগঠন ‘পে ইট ফরওয়ার্ডের’ বৃত্তিও। করোনায় টিউশনি হারালে আবারো পাশে দাঁড়ায় এ সংগঠন। এখান থেকে পাওয়া ১০ হাজার টাকায় নিজের গ্রামে ৭০ শতক জমিতে আমনের বর্গাচাষ করেছেন। এখন সেই ধান ঘরে তুলেছেন।

মানুষের এ ‘ঋণ পরিশোধে’ প্রায় সময় অসহায়দের পাশে দাঁড়াচ্ছেন শিপন। করোনার সময়ে গ্রামে লাশ সৎকারে এগিয়ে গেছেন। গড়ে তুলেছেন প্যারেন্টস কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সংগঠনও। যেটির মাধ্যমে তিনি রাস্তার পাশে পড়ে থাকা মানসিক প্রতিবন্ধীদের চুল-দাঁড়ি কেটে দিয়ে প্রশান্তি জোগান। অন্যের কাছ থেকে কাপড়চোপড় এনে তুলে দেন তাদের গায়ে।

শিপন বলেন, এখন চাকরি হওয়ায় মানুষকে আর্থিকভাবেও সহায়তা করতে পারবো। এর চেয়ে আনন্দ হয় না। তবে সব আনন্দ যেন মাকে বিমানে চড়িয়ে স্বপ্ন পূরণ করতে পারার আনন্দের কাছে ছাপিয়ে গেছে।

Check Also

হয় শয্যা দিন, নয়তো বাবাকে মেরে ফেলুন: ছেলের আকুতি

ভারতে ক;রোনাভাই;রাসে আক্রান্ত এক রোগীর ছেলে দুটি রাজ্য ঘুরেও বাবার জন্য হাসপাতালে শয্যা পাননি। শেষে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!