Breaking News

হত্যা করে বিদেশ, ১৭ বছর পর ফিরেই ধরা!

ঢাকার ধামরাইয়ে ১৭ বছর আগে একজনকে হত্যা করে সৌদি আরব পাড়ি দিয়েছিলেন ফিরোজ আলম নামের এক আসামি। তিনি কিছুদিন আগে দেশে আসেন। বুধবার রাতে তাকে আটক করে ধামরাই থানা পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) তাকে আদালতে প্রেরণ করে। আদালত তাকে জেল হাজাতে প্রেরণ করেছেন। ফিরোজ ধামরাই উপজেলার শরিফবাগ গ্রামের হাবিবুর রহমান হাবির ছেলে।

জানা গেছে ১৭ বছর আগে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একই গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে তৈবুর রহমানকে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ধামরাই পৌরসভার সিমা সিনেমা হলের সামনে ছুরিকাঘাত করেন ফিরোজ আলম। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তৈবুর রহমান। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের পিতা। এ মামলায় কিছুদিন পালিয়ে থেকে ফিরোজ আলম সৌদি আরবে চলে যান। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

সৌদি আরবে ১৭ বছর অবস্থান করার পর কিছুদিন আগে দেশে আসেন ফিরোজ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কালামপুর সাব রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের পেছন থেকে ফিরোজ আলমকে গ্রেপ্তার করে ধামরাই থানা পুলিশ।

ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একটি হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফিরোজ আলমকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করেন।

ঢাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে মা’দক-আড্ডা
মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের চারতলা একটি ভবনের পুরোনো ভাড়াটে বিমু বিশ্বাস। নিচতলায় একা থাকেন তিনি। কেবল সাদা গাড়ি চালিয়ে একটা ভাই আসেন ঘন ঘন। পরের দিকে সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ একটা মেয়ে থাকত বিমুর সঙ্গে। আবু আলী যতটুকু জানতেন, ততটুকু তথ্যই দিয়েছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে।

ভবনের দারোয়ান আবু আলী প্রথম আলোকে জানান, তাঁর ভুল ভাঙে গত আগস্টের শুরুর দিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানের পর। তিনি জানতে পারেন, বিমু যাঁকে ভাই বলে পরিচয় দিয়েছেন, তিনি আসলে তাঁর ভাই নন। অল্প বয়সী মেয়েটাও বিমুদের কেউ নয়। ফ্ল্যাটটি ব্যবহৃত হচ্ছিল মাদক–আড্ডার কাজে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, বিমুর সেই কথিত ভাইয়ের নাম আফিফ আফতাব খান ওরফে সুহৃদ সরকার। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর পকেটে ছিল চার গ্রাম আইস। বিদেশ থেকে বনসাই আমদানির আড়ালে আইস ও আইস সেবনের উপকরণ আমদানির চেষ্টা করছিলেন তিনি। মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে আরও কিছু মাদক–আড্ডার খবর পায় অধিদপ্তর।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে জানান, সুহৃদ সরকারকে গ্রেপ্তারের পর তাঁদের পাঁচটি দল রাজধানীর বনানী, বসুন্ধরা, বারিধারা, ধানমন্ডি ও খিলগাঁওয়ে অভিযান চালায়। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার হন ১০ জন। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরাও ফ্ল্যাট ভাড়া করে মাদক–আড্ডা বসানোর কথা স্বীকার করেন। বনানীর এমন একটি ফ্ল্যাট থেকে হাতেনাতে ধরা পড়েন গ্রেপ্তার ১০ জনের মধ্যে ২ জন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানান, এসব আড্ডায় তাঁরা মাদক সেবনের পাশাপাশি বিক্রিও করেন। তাঁদের প্রত্যেকের ১০–১৫ জন করে ক্রেতা আছেন। আড্ডার মূল অনুষঙ্গ ক্রিস্টাল মেথ বা আইস ও এলএসডি। আড্ডায় অংশগ্রহণকারীরা মূলত সমাজের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। যেমন সুহৃদ সরকারের ভগ্নিপতিদের সবাই সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি। তাঁর স্ত্রীও রাজধানীর একটি খ্যাতনামা কলেজে শিক্ষকতা করেন বলে তাঁরা জেনেছেন।

গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের পর অধিদপ্তর এসব আড্ডায় অংশগ্রহণকারী শতাধিক ব্যক্তির একটি তালিকা তৈরি করে। এ তালিকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীও রয়েছেন। এর পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস ও এলএসডির উৎস সন্ধানের কাজও করছে অধিদপ্তর।

এখন পর্যন্ত ঢাকায় সাত–আটজন পাইকারি আইস বিক্রেতাকে শনাক্ত করেছে অধিদপ্তর। বিক্রেতারা এসব সংগ্রহ করেন কক্সবাজারের ইয়াবা কারবারিদের কাছ থেকে। আর এলএসডি আসছে বিদেশ থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে। এক গ্রাম আইসের দাম ১০ হাজার টাকা। এ কারণে ইয়াবার চেয়েও শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল এই মাদকের ব্যবহার এখনো সীমিত পর্যায়ে।

অধিদপ্তরের বাইরেও মাদকের আড্ডাগুলো সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন এমন একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। কারা এসব মাদক–আড্ডায় যায়, কী সেবন করে, সে সম্পর্কে তাঁরা কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।

কারা পার্টিতে যায়
একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানায়, মাদকের এসব আড্ডায় যারা অংশ নেয়, তাদের বয়স ১৫–১৬ থেকে শুরু করে ৩০–৪০ বছর পর্যন্ত। এই সূত্র নিজে ও লেভেলে পড়ার সময় ইয়াবার সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁর আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের কেউ কেউ মাদকাসক্ত। বিভিন্ন পার্টিতে তাঁদের মাদক সেবনের অভিজ্ঞতা আছে। শনাক্ত হতে পারেন এ আশঙ্কায় তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।

সূত্রটি জানান, শুরুতে খেলাধুলা বা লেখাপড়ায় ভালো করতে অনেকে পরীক্ষামূলকভাবে ইয়াবা সেবন করে। পরে তাদের অনেকেই মাদকসেবীদের আড্ডায় ঢুকে যায়। খ্যাতনামা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তাঁর পরিচিত কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও এসব পার্টিতে যান। সপ্তাহে পাঁচ দিন খাটুনির পর তাঁরা এ আড্ডাকে শ্রান্তি–বিনোদনের জায়গা মনে করেন। যদিও তাঁদের অনেকেই আর কাজে ফিরতে পারছেন না বা নানা শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ে আছেন। এ আড্ডায় শুধু যে মাদকসেবীরা অংশ নেন, তা–ই নয়, মাদকের বিক্রেতারাও আসেন। পার্টির আয়োজক কখনো ব্যক্তি, কখনো আবার হোটেল–রেস্তোরাঁ।

উদাহরণ হিসেবে সূত্রটি গুলশান–২–এর একটি রেস্তোরাঁর কথা বলেন। তিনি জানান, ওই রেস্তোরাঁর মালিক বছরে এক বা দুবার বড় পার্টির আয়োজন করেন। পার্টিতে শুধু আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেন। সেখানেই ক্রেতা–বিক্রেতার পরিচয় হয় এবং তাঁরা ব্যবসায়িক আলাপ সারেন।

কী সেবন করে
সূত্রগুলো জানায়, এই মুহূর্তে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মাদক মাদক হলো আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। এর বাইরে এমডিএমএ ও বিভিন্ন মাদকের ককটেল (মিশ্রণ) সেবনের ঘটনাও ঘটছে। মাদকসেবীদের বড় অংশই নিয়মিত এলএসডি সেবন করে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক দুলাল কৃষ্ণ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস ও এমডিএমএ—এ দুটিই ইয়াবার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। মাদক দুটি সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করলেও পরে স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। মাথার ভেতরের যে কোষগুলো ডোপামিন তৈরি করে, দীর্ঘ মেয়াদে এই দুই মাদক সেই কোষগুলোকে মেরে ফেলে। মাদকসেবীরা সাইকোসিস বা প্যারানয়ার মতো রোগে ভোগেন। হৃদ্‌রোগ, হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তনালি সরু হয়ে যাওয়া, কিডনি রোগ, দাঁত ও চর্মরোগের মতো নানান রোগের কারণ এই দুই মাদক। অন্যদিকে এলএসডি সেবনে দেখা দেয় মানসিক বিকার।

অধিদপ্তরের কাছে এমডিএমএ সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য নেই। কর্মকর্তারা শুধু জানেন, এটিও ‘পার্টি ড্রাগ’।

তবে ২০১৯ সালে ঝিগাতলায় অভিযান চালিয়ে এই অধিদপ্তরই একটি গোপন কারখানার সন্ধান পায়। তখন তারা জানিয়েছিল, ওই কারখানায় আইস বা ক্রিস্টাল মেথ ও ইয়াবা তৈরির উপকরণ মিথাইল অ্যামফিটামিন, ক্রিস্টাল মিথাইল অ্যামফিটামিন, এমডিএমএ তৈরির উপকরণ মিথাইল ডাই–অক্সিম্যাথা অ্যামফিটামিনসহ ১৩ ধরনের উপকরণ পাওয়া গেছে। কারখানায় বিক্রির জন্য প্রস্তুত কয়েক লাখ এমডিএমএও পাওয়া যায় ওই সময়। গ্রেপ্তার হন হাসিব মোহাম্মদ মুয়াম্মার রশিদ নামের এক যুবক। মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষে ঢাকায় নিজের বাসার নিচতলায় তিনি কারখানা গড়ে তুলেছিলেন।

সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলএসডিকে নতুন মাদক বলে দাবি করলেও আদতে এটি এ দেশে আছে বহু বছর ধরে। খুব একটা লুকোছাপা না করেই একসময় বাংলাদেশে এলএসডি এনেছেন বিদেশফেরত লোকজন। দেখতে স্ট্যাম্পের মতো হওয়ায় এই মাদক সহজেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর নজর এড়িয়েছে। এমনকি কুরিয়ার সার্ভিস বা ডাক বিভাগের পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমেও এলএসডি ঢুকেছে বাংলাদেশে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসনের (বিবিএ) ছাত্র সাদমান সাকিব ও আসহাব ওয়াদুদ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির আদিব আশরাফকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের জিম্মা থেকে পুলিশ ২০০ ব্লট এলএসডি উদ্ধার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানান, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ওই মাদক দেশে এসেছে। টেলিগ্রাম অ্যাপে তাঁরা টিম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর মাধ্যমেই নেদারল্যান্ডস থেকে এলএসডি আনান। প্রতি ব্লটে তাঁদের খরচ হয় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা।

Check Also

কলেজ অধ্যক্ষকে নেতার চড় মারার মুহূর্ত ধরা পড়ল ক্যামেরায়

কলেজ অধ্যক্ষকে চড় মারছিলেন এক নেতা। একবার নয়, একাধিকবার। আর সেই মুহূর্তটি ধরা পড়েছে ক্যামেরায়। …

Leave a Reply

Your email address will not be published.