চোঁখের সামনেই ভে’সে গেছে ৩ ছে’লে, কিছুই ক’রতে পারিনি

ভোলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের আয়েশা বেগম(৯২)।১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সেদিনের স্মৃতিকে মনে করে আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, সত্তরের গোর্কীতে চোখের সামনেই ভেসে গেছে ৩ ছেলে। কিছুই করতে পারিনি। সা’রা’রাত কোনমতে গাছ ধরে বেঁচে

থাকলেও ভোর হতেই দেখি ২০সদস্যের পরিবারের ১২ জনই ভেসে গেছে বানের পানিতে। একটি লা’শও পাইনি ক”ব’র দিতে। এমন ঘ’ট’নার বর্ণনা দিতে গিয়ে চোঁখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না আয়েশা।

ভয়া’ল ১২ নভেম্বর রাতের ‘ধ্বং’সযজ্ঞের কথা আজও ভুলতে পারেননি সে। শুধু আয়েশা নয়, উপকূলের ‘ধ্বং’সযজ্ঞের কথা আজও ভুলতে পারেননি ভোলার উপকূলের স্বজনহারা মানুষ। উন্মুক্ত চরাঞ্চলে বসতি গড়া লাখ লাখ মানুষের জীবন এখনও চরম ঝুঁকিতে।

আজ সেই ভয়াল ১২ নভেম্বর! শতাব্দীর প্রল’য়ঙ্করী ঘূ’র্ণিঝ’ড় ও জ’লো’চ্ছ্বাসে সেদিন ল’ণ্ডভ’ণ্ড হয়ে গিয়েছিল ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় বিশাল জনপদ। প্রাণহানি ঘটে ভোলার ২লাখ মানুষের। মারা যায় লাখ লাখ গবাদিপশু ও জী’জ’ন্তু। দেশের উপকূল এখন জুড়ে নতুন ফসল কাটার মৌসুম। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর পরিবেশও ছিল একই। ‘সিডর’,”নারগিস,” ‘আইলা’ “রোয়ানু”র আঘাতের সংবাদ এ অঞ্চলের মানুষ আগাম জানতে পারলেও ’৭০-র ‘গোর্কি’র কথা আবহাওয়া দপ্তর আগে জানাতে পারেনি। প্রকৃতির কাছে আজও অসহায় উপকূলের মানুষ।১২ নভেম্বর অন্য উপকূলের মতো ভোলায় উপকূলেও ৮/১০ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস আ’ঘা’ত হানে।

ভোলার মনপুরা উপজেলার গোমাতলী গ্রামের নূর ইসলাম। পিতাঃ মৃত আবদুল হক। মাতাঃ মৃ’ত’ বিনুজা খাতুন।৬ ছেলেমেয়েকে নিয়ে তার পরিবার। সেই দিনে তিনিও রক্ষা পাননি,বাবাসহ পরিবারের ৯সদস্যকে একই রাতে হারান। এমন স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভে’ঙ্গে পড়েন তিনি। সেদিনের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষ আর গবাদি পশুর লা’শ সৃষ্টি করেছিল এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির। সেদিন মানুষ আর পশুর লা’শ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ভয়াবহ স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে একই ইউনিয়নের সফিউল্লাহ মাষ্টার বলেন, সেইদিন ছিল ১০ রমজান। সন্ধ্যার পর চারিদিকে শোঁ শোঁ আওয়াজে বাতাস বইতে থাকে। হঠাৎ ভ’য়ঙ্ক’র গর্জনে আকাশ অন্ধকার করে প্রচ’ণ্ড বেগে ঝড়ো হাওয়ার শুরু হয়। ওই হাওয়া আমাকে উড়িয়ে কোথায় উঠিয়ে নিয়ে গেছে বলতে পারিনি। পরদিন সূর্যোদয়ের পর আলোতে বাঁশের ঝোঁপ ধরে মাথা তুলে দেখি চারদিকে লা’শে’র’ সারি। লা’শ দেখে পরিবারের লোকজনের কথা কথা মনে পড়ে।

জানা যায়, ১২নভেম্বর এমন বীভৎস ট্র্যাজেডির কথা বিশ্ববাসী থাকুক দূরের কথা দেশবাসীও জানতেন না। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কাউকে জানায়নি। তৎকালীন ‘দৈনিক পূর্ব দেশ’ র ভোলা প্রতিনিধি বর্তমানে দৈনিক বাংলার কণ্ঠের সম্পাদক, বাংলাদেশ বেতারের ভোলা প্রতিনিধি এবং ভোলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এম হাবিবুর রহমানের তোলা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া এই জনপদের ছবি ও সংবাদ নিয়ে তার আত্মীয় খলিলুর রহমান ট্রলারযোগে চার দিন পর ঢাকায় পৌঁছান। ঝড়ের পঞ্চমদিন পূর্বদেশে ছাপা হলে আঁতকে ওঠে সারাদেশের মানুষসহ বিশ্ববাসী। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা ছিল জেলার তজুমদ্দিন উপজেলা। সেখানে ১৬৭০০০ জন অধিবাসীর মধ্যে ৭৭০০০ জনই (৪৬%) প্রাণ হারায়। প্রতি বছর এ দিনটি স্মরণে উপকূলীয় চরাঞ্চলে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শোকাবহ এ দিবসটি পালন করে।

Check Also

বালিশের দাম ৫৩ লাখ টাকা

দেখতে সাধারণ একটি বালিশ, কিন্তু দাম শুনলে চোখ কপালে উঠবে যে কারও। একটি বালিশের দাম …

Leave a Reply

Your email address will not be published.