জামালপুরে হু হু করে পানি বাড়ছে, আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে মানুষ

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে জামালপুরে যমুনা নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। এতে চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আজ রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে পানি ১৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে মানুষ।

ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলী ইউনিয়নের দেওয়ানপাড়া গ্রামের শাহ আলম একটি নৌকায় তাঁর পরিবারকে নিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছেন। তাঁর আঙিনায় এখন হাঁটুপানি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন,‘হু হু করে পানি বাড়ছে। গত শনিবারও চারপাশে পানি ছিল। গত রাতের মধ্যে উঠানে হাঁটুপানি। পাকের (রান্না) ঘরে পানি। খাওয়ার উপায় নেই। নৌকা ছাড়া চলাচল করা যাচ্ছে না। আর একটু পানি বাড়লে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়বে। তাই পুলাপানগরে নিয়ে স্কুলে যাইতেছি। ঘরের খাট-বিছানা, কিছু ধান ও টুকিটাকি জিনিসপত্রও নিয়ে আসছি।’

শাহ আলমের মতো পূর্ব বামনা গ্রামের রুমি আক্তারও তাঁর সন্তান ও আসবাব নিয়ে উপজেলা শহরে আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। তিনি বলেন,‘কোনো উপায় নেই। পাকের ঘরে পানি, ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। সবকিছু ভাসিয়ে নেওয়ার আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে মাইয়ার (মেয়ে) বাপ আছেন। বান বেশি হলে মাইয়ার বাপও চলে আইবে।’

মাঠ-ঘাট সব পানিতে তলিয়ে গেছে। এ কারণে সালমা বেগম গবাদিপশুর জন্য ঘাস সংগ্রহ করে পানি ভেঙে বাড়িতে ফিরছেন। তিনি বলেন, ‘বাড়ির উঠানে হাঁটুপানি। গরু-ছাগলগুলা বানের মধ্যে দাঁড়াইয়া আছে। খের (খড়) পানিতে ডুবে যাচ্ছে। বাজার থাইকা ৬০ টাহা (টাকা) দিয়ে ঘাস কিনা লইলাম। গরু-ছাগলতো বাঁচান লাগব।’ তাঁদের মতো দেওয়ানপাড়া, পূর্ব বামনা, বামনা, দক্ষিণ বামনা, মাঝিপাড়া, ঘোনাপাড়া, হারগিলা, ঢেংগারঘর গ্রামের লোকজন আশ্রয়ের খোঁজে রয়েছেন। যেকোনো সময় এসব গ্রামের ঘরে পানি ঢুকে যাবে বলে স্থানীয় লোকজন জানান।

বন্যায় ফসলের জমি ও পথ-ঘাটসহ বাড়ির আঙিনায় পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে দেখা দিয়ে গবাদিপশুর খাদ্য সংকট। এক নারী গরু–ছাগলের জন্য পাশের বাজার থেকে ঘাস কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আজ রোববার সকালে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার ঢেংগারঘর এলাকায়।

বন্যায় ফসলের জমি ও পথ-ঘাটসহ বাড়ির আঙিনায় পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে দেখা দিয়ে গবাদিপশুর খাদ্য সংকট। এক নারী গরু–ছাগলের জন্য পাশের বাজার থেকে ঘাস কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আজ রোববার সকালে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার ঢেংগারঘর এলাকায়।
আজ সকাল আটটার দিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, ইসলামপুর-নোয়ারপাড়া সড়কের আমতলি এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি বিভিন্ন লোকালয়ে ঢুকছে। পাশেই ঢেংগারঘর একটি সেতুর নিচ দিয়ে তীব্র স্রোত বয়ে যাচ্ছে। চারপাশের মাঠ-ঘাটে পানি আর পানি। ঘরবাড়ির আঙিনা পর্যন্ত পানি চলে গেছে। গ্রামের অনেক সড়ক পানি ছুঁই ছুঁই। যেকোনো মুহূর্তে পানি সড়কের ওপরে উঠে যাবে। চিনাডুলী সরকারি প্রাথমিক ও চিনাডুলী এস এম উচ্চবিদ্যালয়ের আঙিনায় পানি থই থই করছে। নৌকা দিয়ে লোকজন চলাচল করছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বিভিন্ন এলাকার খাল, সেতুর নিচ, কালভার্ট দিয়ে পানি লোকালয়ে ঢুকছে।

নদীর তীরবর্তী ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দী হয়ে পড়তে শুরু করেছে মানুষ। তিন দিন ধরে পানি অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। এসব উপজেলার ২৮টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জামালপুর কার্যালয়ের পানি পরিমাপক (গেজ রিডার) আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ১৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে পানি লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করেছে।

ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হাসান প্রথম আলোকে বলেন, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পানি লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করেছে। দুর্গম ও চরাঞ্চলে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে, কোনো পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ছেন কি না। বন্যা মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো.আলমগীর হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, বন্যা মোকাবিলায় প্রতিটি উপজেলায় ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শুকনা খাবারের বরাদ্দও পাওয়া গেছে। দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় দুটি স্কুলে বেশ কিছু পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মধ্যে দুই মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

Check Also

রুহি তখনো জানে না বাবা নেই

গোলাম মোস্তফা নিরু (২৬)। মাইক্রোবাসের রুজি দিয়েই চলতো সংসার। গাড়ির চাকার সঙ্গে থেমে গেছে তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published.