‘৩০ বছর পর বসতভিটার মায়া ছাড়া লাগিল’

‘৩০ বছর পর বসতভিটার মায়া ছাড়া লাগিল। এবার নদীর ভাঙন যেমন করি হইতোছে, তাতে করি এই জমি আর থাকিল না। তিনটা টিনের ঘর নিয়া এখন ইচলি মসজিদের জায়গাত বসত গড়া লাগবে। অন্যটে যে ঘর তুলমো, সেই টাকাও নাই।’

নদীর পাড় থেকে নিজের ঘর সরিয়ে নেওয়ার সময় এসব কথা বলছিলেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের ইচলি গ্রামের কৃষক আওরঙ্গজেব নওশাদ (৬৮)। তিনি বলেন, এই বসতভিটার প্রতি অনেক মায়া ছিল। দুই পাশে দুইটা পুকুর ছিল। সেই পুকুরের মাছগুলোকে খাবার দেওয়ার সময় তারা দৌড়াদৌড়ি করত। কী সুন্দর ছিল সব। এসব এখন কেবল স্মৃতি হয়েই থাকবে। প্রায় তিন একর আবাদি জমিতে ১০০ মণের মতো ধানের ফলন হয়েছিল। ভুট্টাও আবাদ হয়েছিল ১০০ মণের মতো। ধান কিছুটা টিকবে। বাকি সব নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

নওশাদের স্ত্রী মকসুদা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই ভিটাত কত দিনের সংসার। সেই মায়া ছাড়ি চলি যাওয়া লাগতোছে।’ নওশাদ-মাকসুদা দম্পতির সাত সন্তানের মধ্যে এক ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র। বাকি সবারই বিয়ে হয়েছে। তাঁরা থাকেন অন্যত্র।

শুধু নওশাদ নন, এমন পরিণতি আর দুর্ভোগ হয়েছে আরও অনেকেরই। নিজের ভিটেমাটি আবাদি জমি একের পর এক তিস্তা নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ইচলি গ্রামের প্রায় ২০টি পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। ইউনিয়নের শংকরদহ গ্রামেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এভাবে নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলে পুরো ইচলি গ্রাম নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার লোকজন।

লক্ষ্মীটারি ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে এই ইচলি গ্রামে দুই বছর আগেও প্রায় ৬৫০টি পরিবারের বাস ছিল। কিন্তু গত বছর কয়েক দফা বন্যা এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় নতুন করে এই এলাকা ভাঙতে শুরু করে। গত বছর শতাধিক পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এবারও নদীর ভাঙন তীব্র হওয়ায় মানুষজন ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন।

গতকাল শনিবার বিকেলে ইচলি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নদীর ভাঙন আগের চেয়ে তীব্র হয়েছে। আবাদি জমি ও বসতভিটা ভেঙেই চলেছে। অভাবী মানুষজন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

লক্ষ্মীটারি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, নদীর গতিপথের পরিবর্তন হওয়ায় গত বছর থেকেই এই ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের শিকার হচ্ছে। এর ফলে এলাকার মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুর কার্যালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, চীনের সহযোগিতায় নদীর গতিপথ পরিবর্তনরোধে কাজ করা হবে। তবে কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে জানা যায়নি।

Check Also

রুহি তখনো জানে না বাবা নেই

গোলাম মোস্তফা নিরু (২৬)। মাইক্রোবাসের রুজি দিয়েই চলতো সংসার। গাড়ির চাকার সঙ্গে থেমে গেছে তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published.