পদ্মা সেতুতে বিশৃঙ্খলা কমেছে

২৬শে জুন যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় পদ্মা সেতু। এদিন সকাল থেকেই সেতুতে চড়ে মোটরবাইক, প্রাইভেটকার, জিপ, বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সেতুর দুই প্রান্তে বাড়ে যানবাহনের সংখ্যা। টোলপ্লাজায় দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। পরিস্থিতি সামলাতে বিপাকে পড়ে সেতু কর্তৃপক্ষ। স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে চলে নিয়ম ভাঙার হিড়িক। বেসামাল উৎসুক মানুষ সেতুর উপর গাড়ি থামিয়ে সময় কাটায়, ছবি তোলাসহ টিকটক ভিডিও তৈরি করে। সেতুর রেলিংয়ের নাট খোলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। পদ্মা সেতুতে চলাচলে গতিসীমা প্রতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হলেও সে নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গতির নেশায় মেতে ছিলেন বাইকাররা। প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে স্বপ্নের পদ্মা সেতু পাড়ি দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন কেউ কেউ।

সেতু দর্শনের এই প্রতিযোগিতা বিকালে রূপ নেয় দুর্ঘটনায়। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুইজনের মৃত্যু হয়। এরপরেই নড়েচড়ে বসে সেতু কর্তৃপক্ষ। যান চলাচলের প্রথম দিন রাতেই সেতু বিভাগ অনির্দিষ্টকালের জন্য পদ্মা সেতুতে নিষিদ্ধ করেছে মোটরসাইকেল চলাচল। এর ফলে সেতুতে কমেছে যানবাহনের চাপ।
গত সোমবার সকাল থেকে সেতু সংশ্লিষ্টরা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। সেতুতে বাড়ানো হয় বাড়তি টহল। এর ফলে গাড়ি থেকে সেতুতে নামতে পারছেন না কেউ। দ্রুত গতির যানবাহন কোনো বাধা বিপত্তি ছাড়াই পৌঁছে যাচ্ছে পদ্মা নদীর এক তীর থেকে অন্য তীরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- পদ্মা সেতুতে এখন আর কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। সেতুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়ানোর ফলে কোনো বাস থামতে পারছেন না। কেউ থামাতে চেষ্টা করলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এদিকে সেতুতে মোটরসাইকেল ওঠা বন্ধ হওয়ায় প্রথমদিনের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা কমে গেছে এক-চতুর্থাংশ। একইসঙ্গে টোলের পরিমাণ কমে এসেছে পৌনে এক কোটি টাকা। সেতু কর্তৃপক্ষ বলছেন, গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেন। সেদিন যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। পরদিন রোববার সকাল ছয়টা থেকে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। প্রথমদিন ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা সেতুতে ৬১ হাজার ৮৫৬টি যানবাহন চলাচল করে। এরমধ্যে ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল। মোট টোল আদায় হয়েছিল ২ কোটি ৭৫ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ টাকা।

দ্বিতীয় দিন ২৪ ঘণ্টায় ১৫ হাজার ২৭৪টি যানবাহন পার হয়েছে। টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫৬ হাজার ৬০০ টাকা। এ সময়ে ৭ হাজার ৫৮৬টি যানবাহন মাওয়া প্রান্ত দিয়ে সেতুতে উঠেছে। মাওয়া প্রান্তে টোল আদায় হয়েছে ৯৮ লাখ ১৮ হাজার ৫০ টাকা। অন্যদিকে ৭ হাজার ৬৮৮টি যানবাহন জাজিরা প্রান্ত থেকে উঠেছে। টোল আদায় হয়েছে ৯৯ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫০ টাকা। গতকাল পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের টোলপ্লাজা ছিল অনেকটাই ফাঁকা। স্বাভাবিক গতিতেই চলাচল করছে যানবাহন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও টোলপ্লাজায় যানজট কিংবা কোনো যানবাহনকে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়নি। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিনিয়তই মাইকিং করছে ও সেতুতে টহল দিচ্ছে। সেতু বিভাগ বলছে, পদ্মা সেতুতে টোল আদায় স্বাভাবিক হয়েছে। মোটরবাইক না থাকায় অন্যান্য যানবাহনের চালকরা কোনো প্রকার ভোগান্তি ছাড়াই দ্রুত সময়ে টোল পরিশোধ করে সেতুতে উঠতে পারছেন। ক্রমেই যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। এছাড়া পুরো সেতু সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হবে।

পদ্মা সেতুতে স্পিড গান বসানো হবে। তখন মোটরসাইকেল চলাচলের সুযোগ পাবে। গতকাল নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ বলেছেন, পদ্মা সেতুতে স্পিড গান ও সিসিটিভি স্থাপনের পর মোটরসাইকেল চলাচলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। স্পিড গান, সিসিটিভি মিটার সেট আপের পর হয়তো নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। পদ্মা সেতুর কারণে ফেরি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চাহিদা অনুযায়ী ফেরি চলাচল করবে। আমরা ফেরি বন্ধ করে দেইনি, সেখানে ৬টি ফেরি চাহিদা অনুযায়ী পারাপার করছে। সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তোফাজ্জল হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকারসহ অন্যান্য ভারী যানবাহন যথারীতি পারাপার হচ্ছে। বর্তমানে গাড়ির কোনো চাপ বা যানজট নেই মাওয়া প্রান্তে। তবে কিছু কিছু পিকআপে করে মোটরসাইকেল পারাপার হচ্ছে। পুলিশ, আর্মিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের তদারকি অব্যাহত রেখেছে। লৌহজং সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইলিয়াস হোসেন জানান, গতকাল সকাল থেকে সেতুতে ঠিকঠাক মতো যানবাহন পারাপার হচ্ছে। মূলত মোটরসাইকেলের কারণেই সেতুতে যানজট বা বিশৃঙ্খলা হয়। মোটরসাইকেল চলাচল এখন নেই। সেজন্য সুশৃঙ্খলভাবে গাড়ি চলাচল করছে। পুলিশের টিম সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে।

Check Also

রুহি তখনো জানে না বাবা নেই

গোলাম মোস্তফা নিরু (২৬)। মাইক্রোবাসের রুজি দিয়েই চলতো সংসার। গাড়ির চাকার সঙ্গে থেমে গেছে তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published.