মীরসরাই ট্র্যাজেডি মৃত্যুর কাছ থেকে ফেরার বর্ণনা দিলেন জোনায়েদ

জোনায়েদ কায়সার (১৯)। হাটহাজারীর কেসি জিয়াউর রহমান কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সেই ‘আর অ্যান্ড জে’ কোচিং সেন্টারের যে ১৬ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিরসরাইয়ে খৈয়ারছড়ায় আনন্দ ভ্রমণে গিয়েছিলেন সেখানে তিনিও ছিলেন। ভাগ্যক্রমে তিনি অনেকটা অক্ষত অবস্থায় গাড়ি থেকে বের হয়ে যান। তার হাঁটুুর কয়েকটি স্থানে জখম ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বেডে বসে তিনি কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আনন্দ ভ্রমণের যাওয়ার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে দুর্ঘটনার থেকে বেঁচে ফেরার পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন মানবজমিনকে। জোনায়েদ বলেন, আমাদের কোচিং সেন্টারটা জুন মাসে শুরু হয়েছিল। আমি প্রথম থেকেই সেখানে ভর্তি হই। সজীব স্যারের কাছে (নিহত শিক্ষক জিয়াউল হক সজীব) আগেও পড়েছি। তাই কোচিং সেন্টার শুরুর পর স্যার আমাকে কোচিংয়ে আসতে বলেন।

উনার কথামতো আমি সেখানে যাই। গত শুক্রবারের পিকনিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল ৩ দিন আগে। প্রথমদিকে আমি যেতে না চাইলেও স্যারদের কথাতে রাজি হই। বৃহস্পতিবার বিকালে ৫শ’ টাকা ফি দিয়ে পিকনিকে যাওয়া কনফার্ম করি।
তিনি বলেন, আমরা আমান বাজার থেকে ৪ জন শিক্ষকসহ ১৬ জন মাইক্রোবাসে উঠি। সঙ্গে গাড়ির একজন হেলপার ছিল। সেও নাকি একটা কলেজে পড়ে। আমান বাজারের একটা হোটেলে আগে থেকেই বিরিয়ানির প্যাকেট অর্ডার করা ছিল। সেগুলো নিয়ে আমরা সাড়ে ৯টার দিকে মিরসরাইয়ের দিকে রওয়ানা দেই। মিরসরাইয়ের খৈয়ারছড়া ঝর্ণায় পৌঁছাই সাড়ে ১০টার দিকে। সেখানে আনন্দ করার পর আমরা যাচ্ছিলাম সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী ইকোপার্কের দিকে। কথা ছিল সেখানে গিয়েই আমরা দুপুরের খাবার খাবো। সেখান থেকে বিকালে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিবো। এই শিক্ষার্থী বলেন, আমরা খৈয়ারছড়া থেকে মাত্র বের হয়ে ৫-৬ মিনিট গেলাম। তখন দুপুর প্রায় দুইটা। বাইরে প্রচুর বৃষ্টি। সামনে একটা রেলক্রসিং পড়লো। রেলক্রসিংয়ে কেউ ছিল না। কেউ থামতে ইশারাও দেইনি। আমাদের ড্রাইভার যেইমাত্র গাড়ি রেলক্রসিংয়ে তুললো, পেছন থেকে ট্রেন এসে ধাক্কা দিলো। জোনায়েদ বললো, পেছনের সিটে আমরা ৫ জন ছিলাম। ট্রেনের ধাক্কাতেই মাইক্রোর পেছনের বড়ি খুলে গেলো। আমরা ৫ জনই লাফ দিয়ে পড়ে গেলাম পাশের বিলে। তবে আমার পূর্ণ হুশ ছিল। দেখি আমাদের মাইক্রোকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে ট্রেন সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ওই মাইক্রোতে আমার স্যার ও বন্ধুরা ছিল। তিনি বলেন, বিলে পড়ে যাওয়া আমাদের বাকি ৪ জনের শরীর থেকে দেখি রক্ত পড়ছে। ২ জনের মাথা ফেটে গেছে। ২ জনের হাত-পায়ের বিভিন্ন জায়গায় কাটা।

আমি ছাড়া ৪ জনই সেন্সলেস হয়ে যায়। আমি চিৎকার করে মানুষকে ডাকতে থাকলাম। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে আওয়াজও হয়তো দূরে যাচ্ছে না। এরমধ্যে অনেক মানুষ চলে এসেছে। এরপর এম্বুলেন্সে আসে। আমাদেরকে শহরে নিয়ে আসে।’ ‘রেলক্রসিয়ে গেটম্যান সংকেত দেয়ার পরও মাইক্রবাস চালক কথা না শুনে গাড়ি চালিয়ে দিয়েছে’ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এই অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে এই শিক্ষার্থী বলেন, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। তারা বাঁচার জন্য এমন বলছে। আমি ঘটনার পর দৌড়ে এসে গেটবক্সে যাই। সেখানেও কেউ ছিল না। তাছাড়া এতো জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল যে, ট্রেনের আওয়াজও আমাদের কানে আসেনি। অন্তত ট্রেনের আওয়াজ শুনলেও ড্রাইভার সতর্ক হতো।

Check Also

রুহি তখনো জানে না বাবা নেই

গোলাম মোস্তফা নিরু (২৬)। মাইক্রোবাসের রুজি দিয়েই চলতো সংসার। গাড়ির চাকার সঙ্গে থেমে গেছে তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published.